বিচ্ছেদ
বিচ্ছেদ
লেখক: সাব্বির আহম্মেদ
পৃষ্ঠা ১: শেষ বিকেলের ছায়া
শহরের এই পরিচিত ক্যাফেটা আজ বড্ড অচেনা লাগছে আরিয়ানের কাছে। জানালার বাইরে আকাশটা ঠিক মেঘলার নামের মতোই মেঘাচ্ছন্ন। টেবিলের ওপর রাখা দুটো কফির মগ থেকে ধোঁয়া ওঠা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। আরিয়ান অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জানালার কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা জলের দিকে। সে ভাবছে, সম্পর্কগুলো কি এই জলবিন্দুটার মতোই? কিছুক্ষণ কাঁচের গায়ে লেগে থেকে তারপর নিঃশব্দে হারিয়ে যায়?
“আরিয়ান, কিছু তো বলো...” মেঘলার কণ্ঠস্বর ভাঙা।
আরিয়ান শান্ত গলায় বলল, “বলার তো অনেক কিছুই ছিল মেঘলা। কিন্তু তুমি তো চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছো, তবে আমার বলায় কী-ই বা এসে যায়?”
পৃষ্ঠা ২: বৃষ্টির শহর ও একাকীত্ব
মেঘলা ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেল। আরিয়ান বসে রইল সেই একই জায়গায়। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, মেঘলা একটা রিকশায় উঠছে। রিকশাটা চলতে শুরু করলে মেঘলা একবারও পেছন ফিরে তাকাল না। আরিয়ান অনুভব করল, তার বুকের ভেতরটা যেন মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। সেও ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এলো। ছাতাটা ব্যাগে থাকলেও সে সেটা বের করল না। এই শহরের প্রতিটি বৃষ্টিবিন্দু আজ তাকে বলছে— "তুমি আজ থেকে সত্যি একা।" বাসায় ফিরে সে লাইট জ্বালল না। অন্ধকারে বসে বুঝল, বিচ্ছেদ মানে শুধু মানুষ হারানো নয়, বিচ্ছেদ মানে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া হাজারো ছোট ছোট অভ্যাসকে বিসর্জন দেওয়া।
পৃষ্ঠা ৩: ফ্ল্যাশব্যাক - প্রথম দেখা
আরিয়ানের মনটা আজ থেকে তিন বছর আগের এক ধূসর দুপুরে ফিরে গেল। নীলক্ষেতের এক পুরোনো বইয়ের দোকানের ভেতর আরিয়ান খুঁজছিল জীবনানন্দ দাশের একটি বই। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার পাশে এসে দাঁড়াল এক তরুণী—মেঘলা। পরনে হালকা নীল রঙের শাড়ি, হাতে একটি আধভেজা ছাতা। মেঘলা দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, "ভাইয়া, রূপসী বাংলার কোনো ভালো সংস্করণ আছে?" আরিয়ান তার হাতে থাকা বইটি এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, "আপনি চাইলে এটা নিতে পারেন।" মেঘলা হেসে বলেছিল, "আমি কি আপনার সাথে একটু ভাগ করে পড়তে পারি?" সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল তাদের গল্পের।
পৃষ্ঠা ৪: প্রেমের দিনলিপি
পরের দুটো বছর কেটেছিল স্বপ্নের মতো। আরিয়ান আর মেঘলার পৃথিবীটা ছিল গোধূলি বেলার মতো সুন্দর। প্রতি বিকেলে টিএসসির মোড়ে চা খাওয়া, রিকশায় হুড ফেলে শহর ঘোরা কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা বলা। আরিয়ান তার ডায়েরিতে লিখত, "মেঘলা আমার জীবনের সেই বৃষ্টি, যা রুক্ষ মরুভূমিতেও ফুল ফুটিয়ে দেয়।" মেঘলাও হাসিমুখে বলত, "আরিয়ান, তুমি ছাড়া আমার সব রং ফিকে।" তাদের মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল কেবল একে অপরকে আগলে রাখার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
পৃষ্ঠা ৫: মেঘ জমতে শুরু করা
কিন্তু সময় সব সময় একরকম থাকে না। সম্পর্কের তৃতীয় বছরে এসে মেঘলার মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করল। সে মাঝেমধ্যেই চুপচাপ হয়ে যেত। আরিয়ানের করা অনেক প্রশ্নের উত্তর সে এড়িয়ে যেত। ফোন করলে বলত, "ভালো লাগছে না, পরে কথা বলি।" আরিয়ান ভাবত মেঘলা হয়তো কাজের চাপে আছে। কিন্তু সে জানত না, মেঘলার মনের আকাশে সত্যি সত্যি কালো মেঘ জমা হতে শুরু করেছে। ছোট ছোট বিষয়ে শুরু হতো দীর্ঘ নীরবতা, যা আরিয়ানের সহ্য হতো না।
পৃষ্ঠা ৬: দূরত্বের দেয়াল
মেঘলার পরিবার থেকে তার বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। মেঘলা হঠাৎ করেই লড়াই করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। সে আরিয়ানের সাথে দেখা করা কমিয়ে দিল। আরিয়ান যখনই ভবিষ্যতের কথা তুলত, মেঘলা বলত, "জীবন এত সহজ নয় আরিয়ান।" তাদের দুজনের মাঝখানে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়ে গেল। আরিয়ান দেয়ালটা ভাঙতে চাইত, কিন্তু মেঘলা দেয়ালটার ওপাশেই নিরাপদ বোধ করতে শুরু করল। ভালোবাসা যেখানে ছিল মুক্তির পথ, সেখানে হঠাৎ করেই এক দমবন্ধ করা পরিবেশ তৈরি হলো।
পৃষ্ঠা ৭: বিচ্ছেদের আগের রাত
বিচ্ছেদের আগের রাতে মেঘলা আরিয়ানকে একটা মেসেজ পাঠাল— "কাল বিকেলে আমাদের সেই প্রিয় ক্যাফেতে এসো। কিছু কথা আছে।" আরিয়ান জানত কী কথা হতে পারে, তবু সে মনে মনে প্রার্থনা করছিল যেন ভুল কিছু না হয়। সারারাত আরিয়ান ঘুমাতে পারল না। সে জানালার পাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। আজ তার ডায়েরির পাতাগুলো সাদা রয়ে গেল। সে কেবল অনুভব করল, এক বিশাল ঝড় ধেয়ে আসছে তার জীবনের সমস্ত সাজানো বাগান এলোমেলো করে দিতে।
পৃষ্ঠা ৮: আরিয়ানের ডায়েরি
সেই ডায়েরির একটি পাতায় আরিয়ান লিখেছিল—
"মেঘলা, তুমি যদি কোনোদিন আমাকে ছেড়ে চলেও যাও, আমি তোমাকে দোষ দেব না। কারণ, তুমি আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছো। কিন্তু তুমি কি জানো? বিচ্ছেদের চেয়েও বেশি কষ্ট দেয় সেই স্মৃতিগুলো, যা আমাদের একসময় হাসাতো। আমি চাইলেও তোমাকে ভুলতে পারব না, আর ভুলতে চাইও না।"
এই শব্দগুলো আজ ক্যাফের টেবিলে ফেলে আসা সেই ডায়েরির পাতায় বন্দী হয়ে রইল। মেঘলা ডায়েরিটা সাথে করে নিয়ে গেল না।
পৃষ্ঠা ৯: মেঘলার দৃষ্টিভঙ্গি
ক্যাফে থেকে বেরিয়ে রিকশায় বসে মেঘলা অঝোরে কাঁদছিল। সে আরিয়ানকে ভালোবেসেছে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি। কিন্তু তার পারিবারিক জটিলতা আর নিজের কিছু মানসিক সংকট তাকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়েছিল, যেখানে আরিয়ানকে ছেড়ে যাওয়াই ছিল একমাত্র পথ। সে চায়নি আরিয়ান তার বিষাদময় জীবনের বোঝা বয়ে বেড়াক। মেঘলা নিজেকে অপরাধী মনে করছিল, কিন্তু সে জানত, মাঝে মাঝে দূরে চলে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় আত্মত্যাগ।
পৃষ্ঠা ১০: সময়ের প্রলেপ
ছয় মাস পার হয়ে গেছে। আরিয়ান এখন আর আগের মতো বৃষ্টিতে ভেজে না। সে তার ফটোগ্রাফিতে মন দিয়েছে। শহরের মানুষ তাকে একজন সফল আলোকচিত্রী হিসেবে চেনে। তার ছবির প্রদর্শনীতে মানুষ ভিড় করে। কিন্তু কেউ জানে না, তার তোলা প্রতিটি বিষণ্ণ ছবির পেছনে একজনেরই অনুপ্রেরণা কাজ করে। আরিয়ান এখন একা থাকতে শিখে গেছে। সে বুঝেছে, জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না, তবে জীবন আগের মতো রঙিনও থাকে না।
পৃষ্ঠা ১১: একটি আকস্মিক দেখা
একদিন এক গোধূলি বেলায়, বইমেলার ভিড়ে আরিয়ান দেখল একটি মেয়ে নীল শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটি বই। আরিয়ানের বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। মেয়েটি ফিরে তাকাতেই দেখা গেল—ওটা মেঘলাই। কিন্তু মেঘলার চোখে আজ সেই আগের চঞ্চলতা নেই। দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য। মেঘলার চোখে জল টলমল করছিল। কিন্তু কেউ কারো কাছে এগিয়ে গেল না। মাঝখানের ভিড়টা যেন তাদের সম্পর্কের সেই বিশাল দূরত্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারা একে অপরকে ছাড়িয়ে চলে গেল।
পৃষ্ঠা ১২: উপসংহার - নতুন করে বেঁচে থাকা
বিচ্ছেদ মানেই জীবনের পরিসমাপ্তি নয়। আরিয়ান আজ বুঝতে পেরেছে, মেঘলা তার জীবনে এসেছিল তাকে পূর্ণতা দিতে নয়, বরং তাকে জীবনের গভীরতা শেখাতে। বিচ্ছেদ মানুষকে ভেঙে আবার নতুন করে গড়তে শেখায়। আরিয়ান তার ডায়েরির শেষ পাতায় লিখল— "মেঘলা, আমাদের বিচ্ছেদটা আমাদের ভালোবাসার চেয়েও বেশি শক্তিশালী ছিল। তুমি তোমার আকাশে ভালো থেকো, আর আমি আমার শূন্যতায় তোমাকে খুঁজে নেব।" আকাশ পরিষ্কার হয়ে এক টুকরো চাঁদ দেখা দিয়েছে। আরিয়ান হাঁটছে—গল্পটা শেষ হলেও তার জীবনটা রয়ে গেছে।

Comments
Post a Comment